তিন সফল উদ্যোক্তা

0
179

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন তরুণ উদ্যোক্তাকে পুরস্কৃত করেছেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সফল উদ্যোক্তা অন্যরকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ, ডেভসটিমের প্রধান নির্বাহী আল আমীন কবির এবং বাংলা ভাষায় প্রথম সার্চ ইঞ্জিনের ডেভেলপার রুহুল আমীনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

আল আমীন কবির, সিইও, ডেভসটিম
বাংলাদেশি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ইন্টারনেট মার্কেটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডেভসটিম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আল-আমীন কবির। তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা না করলেও ছোটবেলা থেকেই এই সেক্টরের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল তার। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার পাশাপাশি ফেসবুক, ব্লগিং নিয়ে মেতে থাকতেন। ২০১১ সালের প্রথম দিকে নিজ গ্রামের ওয়েবসাইট তৈরি করে বিজয়ী হন তিনি এবং জাপানে প্রায় ১৫ দিনব্যাপী কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এ ছাড়া মোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নকিয়া আয়োজিত টপ সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার নির্বাচিত হন। তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে প্রাত্যহিক জীবনে পরিবর্তন আসে তার। অনলাইনে পরিচিতি এমন পাঁচ বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ডেভসটিম। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ওয়েবসাইট ডিজাইন-ডেভেলপমেন্ট, ইন্টারনেট মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, অ্যাপ্লিকেশন ডেভলেপমেন্টসহ আগ্রহীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে থাকে। এরই মাঝে জনপ্রিয় আউটসোর্সিং সাইট ফ্রিল্যান্সার ডট কমের আয়োজনে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন ও কনটেন্ট রাইটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ডেভসটিম। পুরস্কার হিসেবে জিতে নেয় ১০ হাজার ডলার। প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আল-আমীন কবির। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে গত ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন আল-আমীন কবির। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠন ‘ডিইউআইটিএস’ এবং বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক [বিডিওএসএন] থেকেও মিলেছে সম্মাননা ও সংবর্ধনা। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তরুণ-তরুণীদের কাজের সুযোগ দিতে আউটসোর্সিং হাব গড়ার স্বপ্ন দেখেন।

Al-amin kabir

মাহমুদুল হাসান সোহাগ, চেয়ারম্যান, অন্যরকম গ্রুপ
অন্যরকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান সোহাগ। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন [ইভিএম] তৈরি করে আলোচনায় এসেছেন বেশ আগেই। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ীর এই তরুণ আক্ষরিক অর্থেই একজন সফল উদ্যোক্তা। এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকারের পর ঢাকা বোর্ডে [ঢাকা কলেজ] থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন তিনি। ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের [বুয়েট] ইলেকট্রিকাল বিভাগে। শিক্ষার্থী থাকাকালীনই বুয়েটের আইআইসিটিতে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সোহাগ বলেন_ চাকরি করা নয়, চাকরি দেওয়ার স্বপ্নই আজীবন লালন করেছেন তিনি। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠা করেন অন্যরকম গ্রুপ। তিনি মনে করেন, উদ্যোক্তা আর ব্যবসায়ী হওয়া এক বিষয় নয়। মানুষ এবং দেশের জন্য কিছু করার তাড়না থেকেই উদ্যোক্তা হতে চেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে [বুয়েট] থেকে পড়াশোনা শেষ করে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছেন। শুরুতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার ডেভেলপের কাজ করেন। পাশাপাশি বন্ধু মাসুম হাবিবকে নিয়ে আউটসোর্সিংয়েও সফলতা পান। এরপর আত্মপ্রকাশ করে পাইল্যাবস নামে করপোরেট প্রতিষ্ঠান। অন্যরকম গ্রুপের প্রথম ভেঞ্চার হচ্ছে পাইল্যাবস বাংলাদেশ লিমিটেড। পাইল্যাবস সোলার চার্জ কন্ট্রোলার, সোলার ইনভার্টার, ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম, ইন্ডাস্ট্রি অটোমেশন নিয়েও কাজ করছেন তিনি। বাংলাদেশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশে সফটওয়্যার রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এটা অ্যামবেডেড সিস্টেম নিয়ে কাজ করে। এখানে দুটি গ্রুপ কাজ করে, একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে আরেকটি এফপিজিএ নিয়ে। এফপিজিএ মাইক্রোকন্ট্রোলার থেকেও আপডেটেড একটা টুল। আর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তো আছেই। ২০০৭ সালে এই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তৈরি করেই মূলত আলোচনায় আসেন মাহমুদুল হাসান সোহাগ। ইতিমধ্যে কয়েকটি নির্বাচনে এই ইভিএম সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যরকম গ্রুপে ইতিমধ্যে যুক্ত হয়েছে অন্যরকম ওয়েব সার্ভিস, অনলাইনে বই বিকিকিনি প্রতিষ্ঠান রকমারি ডট কম, আমদানি-রফতানির অন্যরকম সলিউশন্স, অন্যরকম প্রকাশনী, ওয়েস্টার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং টেকশপ ডটকম। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তার বন্ধু আবুল হাসান লিটন। বর্তমানে শীতের সময় কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল সহজ করতে ‘ভিটিএস’ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন তিনি। আগামীর লক্ষ্য নিয়ে মাহমুদুল হাসান সোহাগ বলেন, শিক্ষা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে। নতুন প্রজন্মের জন্য গবেষণা ও দেশে কাজ করার সুযোগ তৈরির প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

রুহুল আমীন সজীব, ডেভেলপার, পিপিলিকা সার্চ ইঞ্জিন
অন্ধজনে দেহ আলো_ বহুল প্রচলিত এ কথাটিকে বাস্তবে পরিণত করতে মঙ্গলদ্বীপ নামে বিশেষ সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুহুল আমীন সজীব। বাংলাদেশি প্রথম সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’ ডেভেলপের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন নটর ডেম কলেজ থেকে ২০০১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা ‘নীল সবুজের এই কবিয়াল’ [ফেসবুকে তিনি এই নামেই পরিচিত]। ২০০৭ সালের মে মাসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে থেকে সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯৬ [আউট অব ৪] নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে রেকর্ড গড়েন তিনি। ২ বছর সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিজিআইএস পরিচালিত বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট অফিসে সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপ্লিকেশন ‘গ্রিড’ এবং ডেভেলপমেন্ট টিম লিডার হিসেবে সার্চ ইঞ্জিন ‘আই সার্চ’ ডেভেলপ করেন। ২০০৯ সালে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ইতিমধ্যে তার ১৫টির অধিক গবেষণাপত্র দেশি-বিদেশি কনফারেন্স এবং জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার কাজ সহজীকরণের জন্য বাংলাদেশের প্রথম এসএমএসভিত্তিক সিস্টেম ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় এলগরিদম ডেভেলপমেন্ট করেন। তিনি মঙ্গলদ্বীপ এবং সুবচন ডেভেলপমেন্ট টিমের প্রধান গবেষক হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রথম সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’ ডেভেলপমেন্ট টিমের প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। আগামীর স্বপ্ন সম্পর্কে রুহুল আমীন বলেন, এখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়েই ভাবছি। সমাজের এই বঞ্চিত শ্রেণীটিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। মঙ্গলদ্বীপ নিয়ে আমরা প্রতিটি জেলায় যেতে চাই। ইতিমধ্যে জেলাভিত্তিক এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আর আমাদের মূল ভাবনা, মায়ের ভাষায় ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার একটি অবলম্বন তৈরি।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here