ম্যাট কুপারের মুখোমুখি…

১৪ এপ্রিল বিকালে রাজধানীর গুলশানে এমানুয়েলস ব্যানকুয়েট হলে অনুষ্ঠিত ‌’কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ডে’ উপলক্ষ্যে ঢাকায় এসেছিলেন ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস প্রতিষ্ঠান ওডেস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট অব অপারেশনস ম্যাট কুপার। বাংলাদেশী সফল ফ্রিল্যান্সারদের স্বীকৃতি প্রদান, তাদের মতামত নেয়া, ওডেস্কের নতুন কিছু সুবিধা সম্পর্কে ফ্রিল্যান্সারদের অবহিত করা সহ বেশকিছু উদ্দেশ্য নিয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছিল।

ম্যাট কুপারের ঢাকা আসা উপলক্ষ্যে উদ্যোগ নিলাম তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়ার। তবে ওডেস্কের ব্যপারে কথা বলার জন্য বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ না থাকায় দারস্ত হতে হল প্রতিষ্ঠানটির গণমাধ্যম সম্পর্ক বিভাগের। সেখান থেকে দ্রুতই সাড়া মিললো, পল ডিক্সন নামের একজন কর্মকর্তা  যোগাযোগ করিয়ে দিলেন বাংলাদেশে অবস্থানরত ম্যাটের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারের জন্য ঘন্টাখানেকের সময় পাওয়া গেল। বৃহষ্পতিবার সকাল ১১ টা, রাজধানীর ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের লবিতে।

ওডেস্ক কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ডে

হরতালের দিন, কিভাবে পৌছব সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল বেশ। রাত্রে কয়েকবার মেইলে যোগাযোগ হল পলের সঙ্গে, তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত আপডেট নিচ্ছিলেন ম্যাট কুপার এবং মনিকা চুয়াও, কখন পৌছব! রাত্রে বেশ চিন্তার সঙ্গেই ঘুমাতে গেলাম, হরতালের মধ্যে ম্যাটের সাক্ষাৎকার নিতে পৌছতে পারবো তো!!

রাত্রে যতটা টেনশন নিয়ে ঘুমাতে গেছিলাম পরদিন রাস্তায় বেরিয়ে মুহুর্তেই তা দূর হয়ে গেল।  রাস্তাঘাট স্বাভাবিক থাকায় কোন বেগ পেতে হয়নি। ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের লবিতে গিয়ে কেবল বসেছি, তখনই হাজির হলেন ম্যাটকুপার এবং ওডেস্কের কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ম্যানেজার মনিকা চুয়া।

ম্যাট কুপার

প্রথমে কথা হলো কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ডে অনুষ্ঠান নিয়ে, জানতে চাইলাম এমন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। ‘আমাদের সাইটে সবাই অনলাইনে কাজ করে, একে অন্যের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ খুব কমই হয়ে থাকে। অনলাইনেই তাই ওডেস্ক সম্পর্কে এবং নিজের জীবন সম্পর্কে নানা আপডেট দেন আমাদের কনট্রাক্টররা (ফ্রিল্যান্সাররা)। জানুয়ারির প্রথম দিকে একজন ওডেস্ক গ্রাহক নিজের কাজ কর্ম সম্পর্কে টুইটারে একটি আপডেট প্রকাশ করেন। অন্য ফ্রিল্যান্সাররা সেখানে জয়েন করেন এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁদের এ আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি তাঁরা একে অন্যের সঙ্গে অভিজ্ঞতা শেয়ারিংয়ে কতটা আগ্রহী। সেখান থেকেই আমরা কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ডে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি। এরপর অনলাইনে ভোটাভুটির আয়োজন করলে অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সাররা ঢাকাতে এ দিবসটি পালনের দাবী জানান। আমরা ঢাকার পক্ষে ৫ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছিলাম। আর এরপরেই মূলত আয়োজন’ জানালেন ম্যাট।

ম্যাট কুপার

অনুষ্ঠানটি কেমন হল বলে মনে করেন? পাশ থেকে উত্তর দিলেন ওডেস্ক কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ম্যানেজার মনিকা চুয়া। ‌’বাংলাদেশী কনট্রাক্টররা অসাধারণ এনার্জেটিক! সবাই আগ্রহের সঙ্গে আমাদের কথা শুনেছে, প্রশ্ন করেছে। তাদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আর আনন্দঘন এ উৎসব নিজেরাও বেশ উপভোগ করেছি!’

কথা হলো বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং বাজার সম্পর্কে। ম্যাট জানালেন, অনলাইন কাজের এ বাজার এ বছরের শেষ নাগাদ ১ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌছুবে। এটি নির্দিষ্ট কোন সীমারেখায় আটকে নেই, প্রতিনিয়তই তাই এর পরিধি বাড়ছে।  সম্প্রতি আমাদের করা এ সার্ভে থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ৭ হাজারেরও বেশি গ্রাহক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আমাদের সাইটের মাধ্যমে কাজ দিচ্ছে। এরমধ্যে ৭৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করানোর মানুসিকতা নিয়েই আমাদের সাইটে এসেছেন। মোট গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের ৮৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে অনলাইনে দক্ষ কর্মীদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সাধারণ বিষয়ে পরিণত হবে।‘

এ তো গেল গ্রাহক এবং ফ্রিল্যান্স কাজ করিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মতামত। জানতে চাইলাম প্রথাগত কর্পোরেট চাকরির চেয়ে ফ্রিল্যান্সার হিসাবে কাজ করলে একজন দক্ষ কর্মী কোন সুবিধাগুলো বেশি পাচ্ছে? ‌’কর্পোরেট চাকরির চেয়ে অনেকভাবেই বেশি সুবিধা পাচ্ছেন একজন ফ্রিল্যান্সার। নিজে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন, পাশাপাশি আয়ের বিষয় চিন্তা করলেও দেখা যায় তাঁরা কর্পোরেট চাকরির চেয়েও অনেক বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। ওডেস্কের সার্ভে অনুযায়ী, প্রথম বছর একজন ফ্রিল্যান্সার যে মূল্যে শ্রম দিয়ে থাকেন পরবর্তী বছর তা ৬০ শতাংশ বেড়ে যায়! প্রথম বছরে কেউ প্রতি ঘন্টা ১০ ডলার মূল্যে কাজ করলেও পরবর্তী বছরে তার ন্যূনতম শ্রমমূল্য ১৬ ডলার প্রতি ঘন্টায় গিয়ে দাড়ায়। কোন কর্পোরেট অফিসেই শ্রমমূল্য এই হারে বৃদ্ধি সম্ভব নয়!’

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মার্কেটপ্লেসে কেমন কাজ করছে? ‘আমরা বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের অসাধারণ অগ্রগতি লক্ষ্য করছি। ২০০৯ সালে ওডেস্কের মোট কাজের মাত্র ২ শতাংশ করতেন বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সাররা। মাত্র দু’বছরে এ কাজের হার পৌছেছে ১২ শতাংশে। মার্কেটপ্লেসে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় স্থানে। এবছরের প্রথম প্রান্তিকেই বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সাররা ওডেস্কে ৭ লাখ ২০ হাজার ঘন্টা কাজ করেছেন। আগের বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের কাজের পরিমাণ ছিল সাড়ে চার লাখ ঘন্টা। বছরের শেষ প্রান্তিকে এটি দাড়ায় ছয় লাখ ঘন্টায়। প্রতি প্রান্তিকেই ১ লাখ ঘন্টা অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে। আমরা বেশি কাজের পাশাপাশি বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতার ব্যাপারে ইতিবাচক উন্নয়ন লক্ষ্য করছি। বিশেষ করে পণ্য বিক্রি এবং মার্কেটিং সংক্রান্ত কাজেই তাদের বেশি উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে। আমরা প্রত্যাশা করছি এবছর বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সাররা মোট ২৮ লাখ ঘন্টা কাজ করবে!‘

ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং সেক্টরে বাংলাদেশের এ অভাবনীয় উন্নয়নের গল্প শুনে বাংলাদেশী হিসাবে ততক্ষণে অনেক গর্ববোধ হচ্ছিল। জানতে চাইলাম বাংলাদেশীরা মূলত কোন কাজগুলো বেশি করে থাকে? ‘ডাটা এন্ট্রি এবং সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের কাজ বেশি হয়ে থাকে। মোট কাজের ৪২ ভাগই এ বিভাগের। এছাড়া ওয়েব ডেভেলপ, ওয়েব ডিজাইন এবং ক্লায়েন্ট সাপোর্ট ছাড়াও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সহ অন্যান্য কাজও করছেন বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সাররা।‘

বিলিয়ন ডলারের এ মার্কেটপ্লেসের ১২ শতাংশ এখন আমাদের দখলে, এ পরিমাণ টা আরও কিভাবে বাড়ানো যেতে পারে। ম্যাট জানালেন, এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ থাকবে দক্ষতার উন্নয়ন। সাধারণত ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত কাজে প্রকল্প ব্যয় বেশি হয়ে থাকে। আর বেশি ব্যায়ের এ প্রকল্পগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং ভারতের দখলে বলতে গেলে। এধরণের কাজগুলোতে বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। দেখা যায় বাংলাদেশী একজন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার যেখানে প্রতি ঘন্টার জন্য ৩ থেকে ৫ ডলার মূল্যে কাজ করেন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একজন ওয়েব ডেভেলপার প্রতি ঘন্টার জন্য ৩০ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত চার্জ করে থাকেন। কেবল তাঁর দক্ষতার কারণেই এত বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি চার্জ করতে পারছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আমাদের পরামর্শ তোমরা দক্ষতা উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দাও।‘

আল-আমিন কবির

ওডেস্ক যেহেতু বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারদের কাছ থেকে অনেক ভালো ফিডব্যাক পাচ্ছ, তাহলে তোমরা কি তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ নিবে? ম্যাট বললেন, আসলে আমরা অনলাইনে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন টিপস-টিউটোরিয়াল প্রকাশ করে থাকি। রয়েছে ফোরাম-ব্লগ। সেখান থেকেই দক্ষতা উন্নয়নের কাজটি করা সম্ভব। এছাড়া ওডেস্ক কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ডে অনুষ্ঠানেও আমরা বেস্ট প্রাকটিস বিষয়ক বিভিন্ন টিপস দিয়েছি। সরাসরি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষন আয়োজনের কোন পরিকল্পনা এখনও আমাদের নেই।

ম্যাটের এ ইন্টারভিউ যেদিন নিতে যাবো তাঁর আগের দিন অনুষ্ঠিত কনট্রাক্টর অ্যাপ্রেসিয়েশন ডে অনুষ্ঠানে কথা হয়েছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত ফ্রিল্যান্সার শাওন ভূইয়ার সঙ্গে। তিনি অভিযোগ জানিয়েছিলেন, ইল্যান্স ডটকম সহ বেশকিছু সাইটে ফ্রিল্যান্সারদের ন্যূনতম শ্রমমূল্য ৩ ডলার নির্দিষ্ট করা আছে। তবে ওডেস্কে সর্বনিম্ন কোন শ্রমমূল্য নেই। এ কারণে নতুন অনেক ফ্রিল্যান্সার খুব কমমূল্যে সাইটটিতে কাজ করছেন। ইন্টারভিউয়ের সময় প্রসঙ্গটি তুলেছিলাম ম্যাটের কাছে। ‘একজন ফ্রিল্যান্সার তাঁর দক্ষতা অনুযায়ী শ্রমমূল্য নির্ধারণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে উভয়পক্ষ সম্মত হলেই কাজ শুরু হয়। একজন ফ্রিল্যান্সার কম মূল্যে কাজ করবেন এটি তাই আমরা তাঁকেই নির্ধারণ করতে বলি। আপাতত আমাদের ন্যূনতম শ্রমমূল্য নির্ধারণের কোন পরিকল্পনা আমাদের নেই।‘

ফ্রিল্যান্সার নিও তানভির আহমেদ জানিয়েছিলেন আরেকটি অভিযোগ, ওডেস্ক কেবল ঘন্টা ভিত্তিক কাজের জন্যই অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করে। ফিক্সড প্রজেক্টগুলোর টাকা পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠানটি দেয় না, এতে অনেক ফ্রিল্যান্সার কিছু প্রকল্পে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গ তুলতে ম্যাট জানালেন, ‘আসলে অধিকাংশ গ্রাহক দীর্ঘ সময়ের জন্য কাজ করেন। এক্ষেত্রে ঘন্টা ভিত্তিক কাজ করার জন্যই আমরা বেশি উৎসাহিত করি।‘

ম্যাটের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে ঘন্টা পার হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। সর্বশেষ কথা হল বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের নাম করে কিছু প্রতারণার ব্যাপারে। ম্যাট জানালেন, হ্যাঁ আমরা বিষয়টি শুনেছি যে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের নামে কিছু স্ক্যাম সাইট বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর আগে ভারত এবং ফিলিপাইনেও একই ধরণের অভিযোগ শুনেছি। আমরা বলবো ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের বিলিয়ন ডলারের এ বাজারে নিজেদের ভাল অবস্থান এবং ক্রমান্নতি ধরে রাখতে স্থানীয়ভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা সবসময় অনলাইনে সচেতনতা বাড়ানোর ব্যাপারে কাজ করি, স্থানীয়ভাবে তোমাদেরও সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে। প্রতারকদের ঠেকানো না গেলে এক্ষেত্রে নতুনদের প্রবেশ বাধাগ্রস্থ হবে।’

comments

6 COMMENTS

  1. খুব দারুণ লাগলো ইন্টারভিউটি। আসলে ভালো কাজ জানলে এখন এসইও দিয়েও অনেক বেশি কাজ করা যাচ্ছে। আর ডিজিটাল মার্কেটিং দিয়েও তো এখন প্রফেশনাল কাজও অনেকে করছে বিভিন্ন দেশে। যা আশা ব্যঞ্জক।
    ধন্যবাদ আলামিন ভাই। দারুণ অভিজ্ঞতা আমাদের মাঝে শেয়ার করার জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here