চাকরি দিব : ফ্রিল্যান্সার থেকে উদ্যোক্তা!

লেখক : , প্রকাশকাল : 28 January, 2013

Munir Hasanকর্মসংস্থানের নানান উপায় আছে। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এবং প্রচলিত কর্মসংস্থানের তালিকা করলে সেটি সহস্রাধিক হবে তা নিঃসন্দেহ। এর মধ্যে আত্বকর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আত্বকর্মসংস্থানে উদ্যমী যদি তার নিজস্ব কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে না তোলে তাহলে অন্য অনেকেরই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। সে কারণে, যুগে যুগে বিশ্বজুড়ে উদ্যোক্তা তৈরির ব্যাপারে একটি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এমনও অনেক সময় হয় যে, আমরা অনেকেই নিজেদের কিছু কাজ অন্যদের দিয়ে করিয়ে নিতে ভালবাসি। সব সমাজেই এমনটি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু থাকে একান্ত ব্যক্তিগত আর কিছু থাকে সামষ্টিক বা প্রাতিষ্ঠানিক। বাড়ি বানানোর জন্য আমরা রাজমিস্ত্রির শরণাপন্ন হই এবং তাকে কাজে লাগাই, এটি এককালীন একটি কাজ করিয়ে নেওয়া। আগেকার জমিদারবাড়িতে বাজার সরদার থাকতেন, তিনি জমিদারবাড়ির বাজার করতেন।

দেশে দেশে যখন আন্তঃসংযোগ এবং যোগাযোগ বৃদ্ধি পেল তখন বাইরের মানুষ দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার এই সংস্কৃতিও বেশ বিকশিত হল। সেটি আর ব্যক্তি বা গোষ্ঠি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলো না, ছড়িয়ে পড়লো দেশ থেকে দেশান্তরে। আর প্রনোদনা হলো- কয়েকটি শ্রমের মূল্য, শ্রমিকের প্রাপ্যতা এবং দক্ষতা। আজকে আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্প এর বড় উদাহরণ। আমাদের দেশের নারী শ্রমিকরা প্রধানত ইউরোপ-আমেরিকার জন্য পোষাক তৈরি করেন।

বিশ্বের এই বহিঃউৎসায়ন বা আউটসোর্সিং-এর কাজের একটি অনুষঙ্গ হল যোগাযোগ। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার্থে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি মুখ্য হয়ে উঠতে থাকে সব ধরনের কাজে। কোটেশন দেওয়া, ডিজাইন দাখিল করা, কার্যাদেশ পাওয়া ইত্যাদিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ই-মেইল, ইন্টারনেট অথবা বলা ভাল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। ফলে প্রয়োজনের তাগিদেই বিকশিত হয় ইন্টারনেট। আর ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয় ইন্টারনেট ভিত্তিক নতুন এক বাণিজ্য ব্যবস্থা।

উদ্যোক্তা এখন তাঁর পণ্যের প্রচারের জন্য নির্ভর করে ওয়েবসাইট এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের (যেমন: ফেইসবুক!) উপর। নিজের শো-রুমের পরিবর্তে ফেইসবুক পেইজই হয়ে ওঠে তাঁর গ্রাহক সেবা কেন্দ্র, কেনাবেচার ভার্চুয়াল বাজার। অন্যদিকে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আইসিটি নির্ভর কাজ তথা ওয়েবসাইট বানানো, সেটি হালনাগাদ করা, ইন্টারনেটে বিপণন করা ইত্যাদি কাজের জন্য নতুন নতুন ধারনা নিয়ে এগিয়ে আসা তরুণদের খুঁজতে থাকে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ আইসিটি সেবা নয়। ফলে, আইসিটি সেবার একটি বড় খাত গড়ে উঠেছে বিশ্বজুড়ে। ধারনা করা হয়, বিশ্বজুড়ে এই সেবা খাতের মোট বাণিজ্য চারশত বিলিয়ন ডলার।

আইসিটি ভিত্তিক এইসব কাজের বহু-বিভাজন সম্ভব বলে কেউ কেউ ইচ্ছে করলে কোন কাজের অংশ বিশেষ কিংবা সম্পূর্ণ কাজ একাই করতে পারে। আর পারে বলেই তাদের খুঁজে নেওয়ার লোকও তৈরি থাকে।

এভাবে গড়ে ওঠেছে আইটি কাজের ফ্রিল্যান্সিং-এর নতুন আবহ। ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশাজীবী সবসময় ছিল। কিন্তু ইন্টারনেটের কারণে ফ্রিল্যান্স আইটি পেশাজীবিরা এখন অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশেও এখন তরুণ জনগোষ্ঠির একটি অংশ এই পেশাতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই পেশার সবচেয়ে বড় গুণ হলো যোগ্যতা থাকলে কাজ পেতে কোন মামা-চাচার দরকার হয় না। নিজেই নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। বিশ্বের প্রধান প্রধান মার্কেটপ্লেস যেমন ওডেস্ক, ফ্রিল্যান্সার, ইল্যান্স ইত্যাদিতে এখন লক্ষাধিক বাংলাদেশি নিবন্ধিত হয়েছে। এদের অনেকেই নিয়মিত কাজ করছেন। সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৫০ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি ভারী শিল্প পরিবারের কর্মজীবীর সংখ্যা ৪৫ হাজার। সেই তুলনায় মুক্ত পেশাজীবীদের সংখ্যা বাড়ার হার খুবই আশাপ্রদ। এদের অনেকেই নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানেও সহায়তা করছেন। গত কয়েকবছর ধরে চলমান এই ফ্রিল্যান্স পেশাজীবিদের বিকাশের পরের স্তর কি? আজ অনেকেই এই প্রশ্ন করেন? তাঁরা কি আজীবনই ফ্রিল্যান্সার হিসাবে কাজ করে যাবেন?

Enterpreneur
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমরা একজন ফ্রিল্যান্সারের দক্ষতাগুলো বিবেচনা করতে পারি। একজন সফল ফ্রিল্যান্সারের রয়েছে চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতা। তিনি তাঁর ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাঁকে কনভিন্স করেন, তাঁর কাজ করেন এবং অর্থ উপার্জন করেন সেহেতু তার যোগাযোগ ক্ষমতা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন তোলার দরকার নেই বলে মনে করি। আবার তিনি তাঁর কাজটি সম্পাদন করতে পারেন, কাজেই ঐ কাজ সম্পাদনে তাঁর কারিগরি দক্ষতাও প্রশ্নাতীত।

একজন ফ্রিল্যান্সারের যে গুন ইতোমধ্যে রয়েছে, ঠিক এই গুনগুলোই দরকার একজন ব্যক্তির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার জন্য অথবা বলা ভাল তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য। নিজের প্রতিষ্ঠান গড়তে দরকার অদম্য ইচ্ছা, একাগ্রতা, লেগে থাকার গুন, দলের সদস্য নির্বাচনের বুদ্ধি এবং পুঁজি। আমি পুঁজিরকথাটা সবার শেষে লিখেছি কারণ পুঁজি যোগাড়টা এই সবকিছুর মধ্যে সহজতম। আর ফ্রিল্যন্সাররা যদি শুরু থেকে সঞ্চয়ী মনোভাবে আগায় তাহলে তাঁদের পক্ষে পুঁজি যোগাড় করা কোন কঠিন কাজ নয়। আর বাকি গুনগুলোতো তার আছেই।

তাহলে ফ্রিল্যান্সার থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে তার পদক্ষেপগুলো কি হবে?

বাজার বোঝা: প্রথমত নিজের কাজের ক্ষেত্র এবং বাজার স¤পর্কে একটি ধারণা থাকতে হবে। এই জন্য ফ্রিল্যান্সিং-এ নিজের কাজের পেছনে সময় দেওয়ার বাইরেও কিছু বাড়তি সময় হাতে রাখতে হবে। এই সময়টা ব্যয় করতে হবে বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণে।

Career

যোগাযোগ দক্ষতার উন্নয়ন এবং গ্রাহক ধরে রাখার গুন: যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। যেহেতু, এই ক্ষেত্রের বেশিরভাগ কাজ বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষায় করতে হয়, কাজে সেই ভাষা আয়ত্ব করতে হবে, তবে সেটি কেবল ব্যকরণ বিষয় নয়, দরকার সংস্কৃতির ব্যাপারটাও বোঝা। একজন জাপানী ক্রেতার আচরণের সঙ্গে দক্ষিণ-আমেরিকার একজন ক্রেতার পার্থক্য বুঝতে পারাটা জরুরী।

নিজের পণ্য বা সেবা: নিজের বিশেষায়িত পণ্য বা সেবার উন্নয়নের জন্য প্রচেষ্টা নেওয়া। কোন পণ্য বা সেবা মানসম্মত না হলে কেউ কিন্তু সেই সেবাটি কিনতে আসবে না। আর ক্রেতা নেই মানে ব্যবসায়িকভাবে সফলতার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

দল নির্বাচনে খোঁজ খবর নেওয়া: এক্ষেত্রে কেবল কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতে দল নির্বাচন না করে আর্থিক, বিপনন প্রভৃতি দক্ষতায় কর্মী বাছাইয়ের ব্যাপারটা মাথায় রাখা।

উপরের কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে একজন ফ্রিল্যান্সার অনায়াসে একজন উদ্যোক্তা পরিণত হতে পারেন। সারাজীবন একজন ফ্রিল্যান্সার হিসাবেই আপনাকে জীবন পার করে দিতে হবে এমনটি নয়। আপনার উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে পারেন। এতে করে আপনার নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ আসবে।

ফ্রিল্যান্সার থেকে যারা উদ্যোক্তা হবেন তাঁদের সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)

comments

Comments

  1. Moniruzzaman says:

    চমৎকার ভাবে বিশ্লেষন করেছেন স্যার।

  2. thanks a lot information ti share korar jonno..

মন্তব্য প্রদান করুন

*