অনলাইন আর্নিং এর মজার কিছু অভিজ্ঞতা

লেখক : , প্রকাশকাল : 24 July, 2013

আর্নট্রিক্স বন্ধুদের জন্য আজকে আমি ভিন্ন স্বাদের একটি লেখা লেখছি। আমার দীর্ঘ অনলাইন আর্নিং জীবনে (৫-৬ বছরে) অনেক রকম অভিজ্ঞতা আমি অর্জন করেছি, কিছু মনে রাখার মত, কিছু যা ভুলে যেতে পারলেই ভাল তবে আদৌ কি ভুলা সম্ভব সেটাই ভাবি সময়। আচ্ছা বন্ধুরা তাহলে পড়ুন আমার আভিজ্ঞতা গুলো, কে জানে আপনারও হয়তো কোন না কোন ভাবে কাজে লেগে যেতে পারে।

অভিজ্ঞতাঃ ০১

আমার জীবনের সবচেয়ে সুখকর দিন ছিল যেদিন আমি প্রথম পেওনার মাস্টারকার্ড হাতে পাই। আমি প্রায় ১ মাস আগে ওডেস্ক থেকে মাস্টারকার্ডের জন্য আবেদন করেছিলাম। অর্ডার করার পর থেকেই আমি প্রায় প্রতিদিন ভাবতাম কিভাবে আমার কার্ডটা আসবে? কার্ডটা ঠিকমত আমার কাছে পৌছাবে তো? পোস্টম্যান আমার বাসা চিনবে তো? একদিন সত্যিই সত্যিই আমার বাসায় পোস্টম্যান এসে নক করলো। দরজা খুলতেই সরকারি পিওন আমাকে আমার সাদা খামটা দিল। আমি খুশি হয়ে উনাকে চকচকে একটা নোট দিয়ে দিলাম। পিওনও খুশি হয়ে চলে গেল।

সাদা খামটা ছিল নিউ ইয়র্ক থেকে, সেখানে আমার নামটা প্রিন্ট করা ছিল।

আমি সেদিন অনেক খুশি আর এক্সাইটেড ছিলাম। আমার নিজের নামে একটা মাস্টারকার্ড! ভাবতেই কেমন জানি লাগে 🙂

খুশি ছিলাম আরেকটা কারনে সেটা হল আমি নিজে এখন আমার অনলাইন আর্নিং নিয়ে আসতে পারব। এর আগে আমার মামার পেপাল একাউন্টের ভরসায় আমার প্রতিটি মাস অপেক্ষা করতে হত। মামার একাউন্টে টাকাগুলো সেন্ড করতাম আর মামাকে বলতে হত যে ডলারগুলো পাঠিয়ে দাও। যাক এখন আমি স্বাধীন হলাম।

কিন্তু এখন হল আরেক ঝামেলা। টাকা উঠাব কোথা থেকে? পেওনারের ওয়েবসাইটে ২ টা ঠিকানা দেয়া। ২টাই মতিঝিলে। আমি গেলাম একদিন মতিঝিলের উদ্দেশ্যে। কিন্তু যে ঠিকানা দেয়া আছে, সেখানে এখন নতুন বিল্ডিং। শেষমেষ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এর এটিএম এ গেলাম আর কার্ডটা ভয়ে ভয়ে পাঞ্চ করলাম। কি আশ্চর্য আমার নাম লেখা উঠলো। আমি টাকার এমাউন্ট লেখলাম আর টাকা উঠিয়ে ফেললাম। সেটা ছিল আমার জীবনের প্রথম কার্ড দিয়ে টাকা উঠানো। নিজেই নিজের অনলাইন আয় হাতে পেলাম এ এক চরম অনুভূতি। এরপর জানলাম যেকোন মাস্টারকার্ড চিহ্নিত যেকোন এটিএম মেশিনে (এমনকি আমার বাসার কাছের টায়) টাকা উঠানো যায়।

অভিজ্ঞতাঃ ০২

মাস্টারকার্ড পেয়ে আমার অনলাইন জীবনটা আনন্দে ভরে উঠলো। এই মাস্টারকার্ড দিয়ে অনলাইনে শপিং এবং ডোমেইন হোস্টিং কেনা যায়। একদিন আমার এক বন্ধু আমাকে অনলাইন ট্রেনিং এর একটা সাইট পাঠালো, সে আমাকে ট্রেনিংটা করার জন্য রিকমেন্ড করল। সাইটে ১ ডলার দিয়ে সাইন আপ করতে হবে, ঠিক আছে করলাম এবং ট্রেনিং করছি।

একদিন ইমেইল আসলো আমার একাউন্ট থেকে ১৬০ ডলার চার্জ হয়েছে। জানা গেল যে ১ ডলারে ওদের ট্রায়াল অফার ছিল আর প্রতি মাসে ১৬০ ডলার করে সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হবে। আমি তো এব্যাপারে কিছুই জানতাম না আর ভাবলাম হায় হায় আমার ১৬০ ডলার গেল।

এরপর ওদের সাপোর্ট টিমকে ইমেইল পাঠালাম আর সব জানালাম, তারা আমার টাকা আবার আমার কার্ডে ফেরত দিয়ে দিল। আমি শিখলাম যে মানি ব্যাক নামেও একটা জিনিস আছে। এরপর থেকে আমি আর কোন ট্রায়াল অফারে আমার কার্ড দিয়ে সাইন আপ করি না।

অভিজ্ঞতাঃ ০৩

আমার অনলাইন জীবনের সবচেয়ে স্মরনীয় ঘটনাগুলো কার্ডের সাথেই জড়িত। দিব্বি কার্ড ঘষে টাকা তুলছি, একদিন ডাচ বাংলা ব্যাংকের মেশিন টাকা কাটলো কিন্তু আমার হাতে টাকা দিল না। খুবই অসস্থিতে পড়ে গেলাম, বিনা নোটিসে ২০,০০০ টাকা রেখে দেয়াতে। আমার তো তখন মেজাজ খারাপ হল। পেওনারের ওয়েবসাইটে গেলাম, ওরা বলে যে যদি এটিএম এর সাথে সর্ট আউট করতে পারেন তাহলে আগে হতে পারে আর তা যদি না হয় তাহলে ডিসপিউট ফাইল করে ৩ মাসের মধ্যে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। ৩ মাস! এত অনেক সময়।

তো আমি প্রথম রাস্তাটাই বেছে নিলাম। পরের সপ্তাহে আগে গেলাম এটিএম এ, জানলাম মিরপুরে ওদের অফিস। মিরপুরে গেলাম, তারা বললো আমরা কিছু করতে পারবো না, মতিঝিলে তাদের হেড অফিসে যেতে। এরপর গেলাম মতিঝিলে, খুজে বের করলাম তাদের অফিস। তারা বললো, পরের গলিতে তাদের কার্ড ডিভিশন আছে, সেখানে যেতে।

১৮ তালার ওপর ডাচ বাংলা ব্যাংকের কার্ড ডিভিশন, গেলাম। সেখানের পিওন বলে, এই কাগজে একাউন্ট নাম্বার লিখতে। আমি কি লিখব আমার তো কার্ডের সাথে কোন একাউন্ট নাই, যাই হোক বসে রইলাম। কয়েকজন স্টাফের সাথে কথা বললাম, এরপর সর্বশেষে জানলাম ওরা কিছুই করতে পারবে না। এ আর নতুন কি? শুধু শুধুই ১টা দিন নষ্ট হল।

এরপর ডিসপিউট ফাইল করলাম। পেওনারের একটা ফর্ম আছে যেটা হাতে লিখে সাইন করে স্ক্যান কপি তাদেরকে সেন্ড করতে হয়। মেলা ঝামেলার কাজ! কি আর করার ২০,০০০ টাকা, করতেই হবে।

এরপর আমার মনে আছে প্রায় ৩ মাস পর টাকাটা ফেরত পেলাম।

অভিজ্ঞতাঃ ০৪

পেপাল একাউন্টে একদিন এক অজানা সোর্স থেকে ২০০ ডলার আসলো। আমি বুঝতে পারলাম না কিভাবে টাকাটা এলো। অনলাইনে কি তাহলে ভুল করেও টাকা আসে? যা হোক আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম সেদিন। পরে জানতে পারলাম আমার একটা সাইটের এফাইলিয়েট কমিশন পেয়েছি। অনলাইন বিজনেস এমনই, অনেক সময় এভাবেই আনএক্সপেক্টেডলি কোথা থেকে পেমেন্ট এসে পড়ে।

কয়েকদিন আগে বিডভারটাইজার থেকে ৫০ ডলার পেয়ে গেলাম। ব্লগিং এর শুরুর দিকে সাইন আপ করেছিলাম, তাও আবার ২০০৮ এর দিকে। একটাও সেন্ট আসেনি। আর সেদিন তারা পুরো ৫০ ডলার পাঠিয়ে দিল।

পেয়েছি যেমন, অনেকবার ডলার হারিয়েছিও। আমার ওয়েব ডিজাইনের ক্লায়েন্ট একদিন ২০০ ডলার পেপালে সেন্ড করল। আমি আমার একাউন্ট চেক করতেই আমার পেপাল ব্লক হয়ে গেল। সাথে সেই ২০০ ডলারও গেল। এরকমই হয় যখন দেশে পেপাল ব্যবহারের কোন বৈধ উপায় থাকে না।

অভিজ্ঞতাঃ ০৫

অনলাইনে কাজ করে একটা জিনিস আমি শুরু থেকেই করেছি, যেটা হল ব্র্যান্ডিং। আমি আমার নিজের নামে আর আমার ব্লগের নামকে ব্র্যান্ড করেছি। সে সময় বিদেশি যারা ছিল তাদের মধ্যে খুব কম ব্লগার ছিল যারা নিজের নাম প্রকাশ করে ব্লগ লিখত। ছ্বদ্মনামে ব্লগ লেখা একটা ট্রেন্ড ছিল। আমি সেটা ভাঙলাম আর নিজের নামে ব্লগ লেখতে থাকলাম। এতে আমি অনেক হাইপ পেয়ে গেলাম। অনেক মানুষ আমাকে চেনা শুরু করল।

কয়েকবার আমি বাইরে গিয়েছি আর কেউ কেউ আমাকে চিনে ফেলেছে। সেলিব্রিটির মত ব্যাপার স্যাপার আর কি। আমি বুঝতে পারলাম না যে শুধুমাত্র অনলাইনে লিখে এভাবে জনপ্রিয় হওয়া যায়। আমি শুরু থেকেই কার্যকর কিছু লিখেছি। যে কেউ অনলাইনে কাজ/ব্লগ করতে চেয়ে গুগলে সার্চ দিয়েছে সে অন্তত একবার আমার ব্লগ, ব্লগকরি-কে খুজে পেয়েছে।

একদিন বেসিসের একটা মিটাপ ছিল। আমি সেখানে পৌছে একজনকে জিজ্ঞ্যেস করলাম এটাকি সে জায়গা কিনা? সে লোকটি আমাকে দেখেই বলে আরে তমাল আনোয়ার ভাই? কেমন আছেন?

আরেকদিন বসুন্ধরা প্লাজার সামনে আরেকজন ডাক দিল আর আমাকে বলে সে আমার ব্লগের পাঠক। এভাবে প্রতিনিয়তই কেউ না কেউ আমাকে পেয়ে যায়। অনলাইন আর্ন করতে গিয়ে সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা আমার এটাই।

অভিজ্ঞতাঃ ০৬

অনলাইনে ব্লগ লিখে অনেক প্রশংসা আমি শুনেছি আবার অনেকে গালিগালাজও করেছে আমাকে। আমার প্রথম ব্লগে আমি এমএলএম (ডেসটিনি/নিউওয়ে/গ্যানেক্স/টাইন্স) এর ব্যাপারে লেখতাম। সেসময় প্রায়ই কিছু মানুষ গালিবাজি করতো আমার ব্লগে। যেহেতু অনেক কোম্পানী মানুষের টাকা হাতিয়েছে সেহেতু অনেক ভূক্তভোগী রয়েছে আর তাদের এভাবে গালিগালাজ করাই স্বাভাবিক।

যখন আমি ব্লগকরি ব্লগটা চালু করি, এতে আমি শুধুই অনলাইন ব্লগিং আর আয়ের কথা লেখি। এখানে তো কারো গালিবাজি করার কোন কারন দেখি না। কারন ব্যাপারটাও তখন বিশ্বে নতুন ছিল, বাংলাদেশে তো কেউ এব্যাপারে শুনেওনি মনে হয়, তবে ছিলো হয়তো নিভৃতে। কিন্তু তার পরেও ২-৩টা এমন কমেন্ট পেয়েছি আমি।

আমি অনেক ইমেইল পাই যেখানে মানুষ অসংখ্য প্রশ্ন করতো; কিছু কিছু প্রশ্ন ছিল যার উত্তর আমি ব্লগ পোস্টেই লিখে রেখেছি। তারপরেও যখন অনেকে বারবার ইমেইল করে বিরক্ত করতো তখন অনেকসময়ই আমি ডাইরেক্টলি না বলে দিতাম।

এভাবে একদিন একজনকে না বলায় সে আমার ওপর প্রচন্ড রেগে গেল আর ইমেইলে গালিবাজি করতে থাকলো।

আমি বিষয়টা পাত্তা দিলাম না কিন্তু সে আবার টুইটারে আক্রোশমূলক কথা, গালি, আমি আর আমার ব্লগকে সে ধ্বংস করে দেবে এধরনের কথা বলতে থাকলো। ইমেইল পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু পাবলিক প্ল্যাটফর্মে এটা তো মেনে নেয়া যায় না।

তো আমি তার ইমেইল আর টুইটগুলো কপি করে আমার সোর্সদের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। এরপর সে ব্যাক্তির আসল পরিচয় বের করলাম। অনলাইনে মানুষ ছদ্মনাম নিলেই ভাবে তাকে আর কেউ পাবে না। আমি তার আইপি আর ইমেইল আইডি ট্রেস করে তার নাম, ছবি, ঠিকানা, এমনকি তার ইল্যান্স প্রোফাইল, সে কোন কলেজ থেকে এস এস সি/এইচ এস সি পাশ করেছে তাও বের করে ফেললাম।

এরপর তাকে আমি ইমেইল করলাম যে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে, নয়তো তার বিরুদ্ধে আমি মামলা করবো। এরপর তার ইমেইল আসলো যে সে আমার কাছে মজা করছিল, আর তাকে যেন আমি মাফ করে দেই, তার বিরুদ্ধে যেন কোন একশন না নেই।

ভাই থামেন!

কেউ মজা করার জন্য কখনো কারো গুষ্টি উদ্ধার করে না। যাই হোক বেচারা অনেক ঘাবড়ে গিয়েছিল তাই তাকে ছেড়ে দিলাম।

অভিজ্ঞতাঃ ০৭

ডেভসটিম লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিস্থান ডেভসটিম ইনস্টিটিউটে আমি একবার গিয়েছিলাম ব্লগিং আর এফিলিয়েট মার্কেটিং কোর্স এর গেস্ট টিচার হয়ে। আমি সেখানে মটিভেশন ইন ব্লগিং এর বিষয়ে একটা ছোট্ট প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলাম।

খুব ভালই লেগেছিল আমার ফেস টু ফেস কিছু মানুষকে লেকচার দিয়ে। আরো ভালো লেগেছিল স্টুডেন্টদের উৎসাহ দেখে। প্রেজেন্টেশনের পর সবাই আমাকে ঘিরে ধরে ছবি তুললো, ফোন নাম্বার নিল, পরে অনেকে আমাকে ফোন করেছে, ইমেইল করেছে।

সেদিন আমার মনে হল যে এতগুলো বছর অনলাইনে কাজ আমার জীবন সার্থক হয়েছে।

এই ছিল অনলাইনে কাজ করে আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা। কেমন লাগলো আপনার? কমেন্ট করে জানান। আপনি যদি অনলাইন আর্নিং এর ব্যাপারে আমার লেখা টিপস পড়তে চান তাহলে আমার নতুন ব্লগটা পড়তে পারেনঃ- OnlineEarningKing.com

comments

Comments

  1. farhad says:

    ওয়েব সাইট অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রাম এর বিস্তারিত ধারনা এবং এর সম্পর্কে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা

মন্তব্য প্রদান করুন

*