ব্রডব্যান্ড ও উদ্যোক্তাবান্ধব বাজেট চাই

লেখক : , প্রকাশকাল : 22 April, 2013

Munir Hasanনির্বাচনের বছরে এবং সরকারের এই মেয়াদের শেষ বাজেটের কাজ শুরু হয়েছে। যথারীতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের, বিশেষ করে বণিক সমিতিগুলোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে। তবে, আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তাদের পক্ষে এই আয়োজনে যুক্ত হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে নতুন যারা প্রতিবছর কর্মবাজারে আসছে এবং যারা কর্মবাজারে আসার জন্য তৈরি হচ্ছে, তাদের কথা শোনার কোনো ফোরাম থাকলে সেটি হয়তো আরও কার্যকরী হতো সরকারের পক্ষে।

গণিত অলিম্পিয়াড, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক এবং সাম্প্রতিক কালে ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’ গ্রুপের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে আমার পক্ষে এই শ্রেণীর একটি বড় অংশের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি জানার সুযোগ হয়েছে। সেই আলোকে আমি আসন্ন বাজেটের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরতে চাই।

আমরা এখন জানি, সংযুক্তিই হলো উৎপাদনশীলতা। এই সংযুক্তির একটি বড় অংশ আমরা ইতিমধ্যে পূরণ করেছি। বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের সেই দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে প্রায় ৯৮ শতাংশ এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিশ্লেষকদের সব হিসাব ভণ্ডুল করে বিগত চার বছরে দেশে মোবাইল ফোনের গ্রাহকসংখ্যা সাড়ে চার কোটি থেকে সাড়ে নয় কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক কেবল যে কথা বলায় ব্যবহূত হচ্ছে তা-ই নয়, বরং এটি মানুষের উৎপাদনশীলতাকেও বাড়িয়েছে কয়েক গুণ এবং তার সঙ্গে যুক্ত করেছে নির্ভরতা ও নিরাপত্তা। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের একটি বিজ্ঞাপনে এই স্বস্তির ব্যাপারটা আমরা দেখতে পাই যখন সন্তানের পাঠানো টাকা বাবা খুব সহজে হাতে পান। মোবাইল ফোনের এই নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ইন্টারনেটেরও প্রসার ঘটছে প্রতিনিয়ত।

২০০৯ সালের জুলাই মাসে যেখানে ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুকে বাংলাদেশি ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ৯৬ হাজার, এখন তা প্রায় ৩৩ লাখের বেশি, যার অধিকাংশই তরুণ। সংযুক্তির জন্য কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মাসের খরচ তার থাকা-খাওয়ার খরচের চেয়েও বেশি হয়। কিন্তু দেশে ইন্টারনেটের বিস্তার যতটা হয়েছে ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ততটা হয়নি। অন্যতম কারণ, হচ্ছে ব্রডব্যান্ড বিস্তারে সরকারের বিশেষ কোনো প্রণোদনা নেই আর এটি না থাকায় বেসরকারি উদ্যোগগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে যাচ্ছে না। তাদের সাফ জবাব হচ্ছে, ঢাকার বাইরে তাদের ব্যবসায়িক কেস নেই। অথচ মাত্র ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে এই চিত্র পাল্টে দেওয়া যায়। এর থেকে মাত্র ৩০ কোটি টাকা খরচ করে দেশের কমপক্ষে ২০০টি স্থানে ৫ মেগাবিটের উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই জোন তৈরি করা যায়।

এগুলোতে মাত্র এক থেকে দুই বছরের ব্যান্ডউয়িডথের খরচ সরকার দেবে। আমরা আনন্দের সঙ্গে মনে রেখেছি যে এই সরকারের আমলে প্রতি মেগাবিট ব্যান্ডউয়িডথের খরচ ৩৮ হাজার থেকে এখন চার থেকে আট হাজার টাকায় নেমে এসেছে। বিনা মূল্যের ওয়াই-ফাই জোনগুলো যে ব্যবহারকারীদের তৈরি করবে, তাতে পরবর্তী সময়ে ব্রডব্যান্ড অপারেটররা সেখানে হাজির হবে। যেহেতু বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্রডব্যান্ড সংযোগের কাজ চলছে, কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আলাদা করে কোনো উদ্যোগ না নিলেও হবে। তবে, দেশের বড় বড় কলেজে ব্রডব্যান্ড সংযোগের জন্য আর ২০ কোটি টাকা খরচ করা যেতে পারে। এই টাকায় ঢাকা, তিতুমীর, চট্টগ্রাম, ইডেন, সারদা সুন্দরী, ব্রজমোহন, আনন্দমোহন কলেজের মতো কলেজগুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হবে।

আর ৩০ কোটি টাকা বিটিসিএলকে দিয়ে এখনো যে শহরগুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া কঠিন, সেখানে সে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সঠিক নেতৃত্ব ও যথার্থ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজ কয়েক মাস সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। এর পাশাপাশি ইন্টারনেটের ব্যান্ডউয়িডথের ওপর ১৫ শতাংশ হারে চালু থাকা মূল্য সংযোজন কর ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।

এই অবকাঠামো তৈরি হলে আমাদের তরুণ এবং স্বতন্ত্র উদ্যোক্তারা তাঁদের নিজেদের পথ খুঁজে নিতে পারবেন। আমরা অনেকেই জানি, বর্তমানে দেশের তরুণ-তরুণীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলছেন। ২০১২ সালে তাঁদের গড় দৈনিক আয় ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। কেবল ব্রডব্যান্ডের প্রসার আরও অনেক যুবাকে এই ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে। আমার প্রথম চাওয়া মাত্র ১০০ কোটি টাকার মধ্যে বাকি ১০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে এই তরুণদের আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্স মার্কেটের জন্য দক্ষ করে তৈরি করার কাজে।

এই জন্য টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং মুখোমুখি প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে এই টাকায়। তবে, ব্রডব্যান্ডের এই প্রসারের পাশাপাশি ইন্টারনেটে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হবে। বাকি ১০ কোটি টাকা খরচ করা হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলাদি, কাজী নজরুল ইসলাম, মীর মশাররফ হোসেন, জসীমউদ্দীনের সাহিত্যকর্মকে ডিজিটাল দুনিয়ায় উন্মুক্ত করার কাজে।

অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড আর কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারলেই কর্মপ্রত্যাশীদের এক বড় অংশকে আমরা আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যোগী করে গড়ে তুলতে পারব। মনে রাখা দরকার, প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী আমাদের কর্মবাজারে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রীয় কিংবা বেসরকারি বড় উদ্যোগের মাধ্যমে সর্বোচ্চ এর ১-২ শতাংশ কর্মচাহিদা পূরণ করা যাবে। কিন্তু যদি এদের ১০ শতাংশকে উদ্যোক্তা বানানো যায়, তাহলে তারাই বাকি ৯০ শতাংশের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। এই জন্য দরকার উদ্যমীদের পথের বাধা সরিয়ে দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো থেকে সহজে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া যায় কিন্তু একজন টি-শার্ট উদ্যোক্তা এক লাখ টাকা ঋণ পান না। আমি প্রস্তাব করছি, এ বছরের বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়নের নামে ১০০ কোটি টাকা জলে দেওয়া হোক। এই টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের দেওয়া হবে। তবে এটি সরাসরি দান হবে না।

এটি শতকরা ৯% হারে ঋণ হবে। এই ঋণপ্রাপ্তির জন্য উদ্যোক্তাকে শত পৃষ্ঠার কোনো রিপোর্ট, প্ল্যান কিছুই লিখতে হবে না। কেবল তার ধারণা এবং কী করবে, সেটি বাংলা ভাষাতেই ব্যাখ্যা করবে। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সেটিকে তাঁদের মতো করে সাজিয়ে লিখে নেবেন এবং প্রথম স্ক্রিনিংয়ে পাস করার দুই সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে ঋণ দেওয়া হবে। তবে, যেসব সামগ্রী তাঁর কিনতে হবে, সেগুলো তাঁকে সংগ্রহ করে দেওয়া হবে, টাকা দেওয়া হবে না।

যেমন কারও যদি ল্যাপটপের দরকার হয় তাহলে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকে ল্যাপটপ নিতে হবে, যদি গরু কিনতে হয় তাহলে রাষ্ট্রীয় কোনো খামার থেকে তাঁকে গরু বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আমি জানি, অনেকেই এক্ষুনি গেল গেল করে রব তুলবেন। আমি বলব, ১০০ কোটি টাকা তেমন কোনো বড় অঙ্কের টাকা নয়। এই টাকার কোনো খোঁজখবর না হলেও দেশের কিছু যাবে-আসবে না। তবে, কয়েক বছর ধরে যে উদ্যমী তরুণদের আমি দেশের আনাচকানাচে দেখেছি, তাঁরা সবাই মনের আনন্দে এই টাকা ফেরত দেবেন। এটি আমি লিখে দিতে পারি। উদ্যোক্তা উন্নয়নের এই তহবিল শেষ বিচারে কর্মপ্রত্যাশীদের আয়ের রাস্তা তৈরি করবে। আর আয়ই হলো উন্নয়ন।

এই সঙ্গে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে কেবল দেশেই আমরা আমাদের কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারব না। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন কর্মবাজার তৈরি হচ্ছে। যেমন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে কাতারে এক বিশাল কর্মীবাজার সৃষ্টি হচ্ছে। আমার প্রস্তাবের তৃতীয় ১০০ কোটি টাকা আমাদের কর্মীবাহিনীকে বিশ্ববাজারের জন্য দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য খরচ করা হবে। আমাদের শ্রমিকদের সামান্য ইংরেজি জ্ঞান এবং দক্ষতার সনদ (কম্পিটেন্সি সার্টিফিকেট) থাকলেই তাঁদের কর্মমূল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই ১০০ কোটি টাকার একটি অংশ ব্যয় হবে নতুন কর্মবাজার খুঁজে বের করার কাজে।

সস্তা শ্রমবাজারের পরিবর্তে আমাদের খুঁজতে হবে জ্ঞানের বাজার। পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে সবচেয়ে বেশি মানুষের বাস। এ কথাটিকে এভাবেও বলা যায় যে আমাদের দেশ হচ্ছে পৃথিবীর প্রতি বর্গকিলোমিটারের সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার দেশ। কারণ, মানুষই এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। ১০০ কোটির আরেকটি অংশ ব্যয় হবে এই খাতে শিক্ষিত এবং যারা মানুষকে মর্যাদা দেয়, এমন উদ্যোক্তা তৈরি করার কাজে। আমাদের শিক্ষার্থী কিংবা কর্মীরা বিশ্বমানের। আমাদের কাজ হবে, তাদের রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে কানে কানে বলে দেওয়া, এই পৃথিবীটা তোমার।

মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

comments

মন্তব্য প্রদান করুন

*